নাগরিক উন্নয়নের সংগে সংগে আরও কত কিছু হারিয়ে যায়! টিউবওয়েল ছিল তখন। এখন ট্যাপের জামানা আসার পরে টিউবওয়েলও হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন তো ঘরের ভেতরেই বাথরুম, রান্নাঘর। সেখানেই পানির ট্যাপ। কিন্তু আমাদের ছোটবেলায় সাবালিয়ায় তো আর এসব লাইন তেমন ছিল না। সবার বাড়িতে ছিল টিউবওয়েল। যাদের বাসায় টিউবওয়েল ছিল না তারা এর ওর বাড়ি থেকে পানি আনতো। যেমন নানুদের বাসার পেছনে তিনতলায় মিতুরা থাকত ওরা পানি নিতে আসত নানুদের বাসায়। একদিন আমি গোসল করছিলাম টিউবওয়েলে, মিতু পানি নিতে আসল। আমাকে বলল ভাইয়া একটু সরেন প্লিজ পানি নিব। তখন প্লিজ শব্দটা এখনকার মত এত ডালভাত হয়ে যায় নি, আমি জিজ্ঞেস করলাম মিতু প্লিজ মানে কিরে, সে সগর্বে আমাকে শিখিয়েছিল প্লিজ মানে তাড়াতাড়ি। বহুদিন আমি প্লিজ শব্দটি তাড়াতাড়ি অর্থেই ব্যবহার করেছি।
এই টিউবওয়েল সারাই করা ছিল একধরনের উত্তেজনার ব্যাপার, এতে ওয়াশার নামে একধরনের টায়ারের বা প্লাস্টিকের চাকতি থাকত, আর প্রতি গরমে বেশিরভাগ টিউবওয়েলের এই চাকতি পরে যেত। সাধারণত বাবাদের দায়িত্ব থাকত এই ওয়াশার ঠিক করা। র্যাঞ্জ দিয়ে টিউবওয়েলের মাথা খুলে খুলে এই ওয়াশার লাগাতে হত, প্রতিটি বাবাই তখন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। আমিও ক্লাস থ্রিতে প্রথম ওয়াশার ঠিক করে নিজের বাড়িতে বিরল সম্মান অর্জন করেছিলাম। আরেকটা কাজ ছিল টিউবওয়েলে প্রায়ই পানি উঠতো না আর চাপলে একধরনের বিটকেল শব্দ করত। এর মাথা দিয়ে কিছুটা পানি ঢেলে অসংখ্যবার চাপলে তবে এ থেকে পানি উঠতো। এ কাজ গুলো করত মায়েরা। আরেকটা পেশা এই টিউবওয়েলের সংগে জড়িত ছিল, সেটা হচ্ছে টিউবওয়েল চোর। চোরের কথা ছোট বেলায় অনেক শুনেছি। কিন্তু চোরেরা যেহেতু অনেক রাতে আসে তাই চোর কক্ষনও চোখে দেখি নি। অনেক রাত জেগে থেকেছি চোর দেখার জন্য কিন্তু যে রাতে জেগেছি কোন অজ্ঞাত কারণে চোর আর সে রাতে আসে নি। ছোট বেলায় প্রতি রাতে ঘুমাতে যাবার সময় দোয়া পড়ার সময় মনে মনে আল্লাহকে বলেছি আজকে একটা চোর দেখিয়ে দিও। সে মনের আশা কোনদিন পূর্ণ হয় নি। কিন্তু একদিন আসল সেই মহেন্দ্রক্ষণ, চোর ধরা পরল সাবালিয়ায়। সেই তো ধরাই পরল কিন্তু ভর দুপুরে! যখন আমাদের স্কুলে ক্লাস হচ্ছে! জেলা সদর স্কুল থেকে সাবালিয়া কত দূর! কখন গিয়ে পৌছাব আর কখন চোর দেখব? যদিও তখন কোন মোবাইল ছিল না তারপরও কীভাবে যেন খবর পৌছে গেল স্কুলে। সাবালিয়াতে টিউবওয়েল চোর ধরা পরেছে। আমার সে কি উত্তেজনা! সাবালিয়ায় যারা বড় হয়েছেন তাদের অনেকে হয়তো চিনবেন রবিনদের মাঠ। সেই মাঠে চোর বেঁধে রাখা হয়েছে। আমরা সবাই মানে সাবালিয়ার সমস্ত আন্ডা বাচ্চা যখন তারা জেলা সদর স্কুলে পড়ি সবাই মিলে সোৎসাহে ছুটলাম চোর দেখতে। স্কুলও অঘোষিত ছুটি, স্যাররা হয়তো ভাবলেন এলাকায় চোর ধরা পড়েছে আর এই কোমলমতি শিশুরা এ আজব জিনিস দেখা থেকে বঞ্চিত হবে তা কি করে হয়। সারা রাস্তা আমি প্রায় দৌড়েছি, শুনেছি চোর নাকি বেশ দ্রুত পালিয়ে যায়! এমন একটা প্রাণি যার শিং আছে, রাতের অন্ধকারে ঘুরে বেড়ায় আর মানুষ দেখলেই পালিয়ে যায়! আমি মোটামুটি দমবন্ধ করে ছুটেছি। স্কুল থেকে বের হয়ে সার্কিট হাউসের ভেতর দিয়ে, লেকের পাশ হয়ে, ডিস্ট্রিক্ট গেটের নিচ দিয়ে, ময়মনসিংহ রোড ক্রস করে ক্যাম্পের পুকুরের পাশ দিয়ে কী যে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলা। বড় ভাইরা আগে ছুটছে। আর কত যে কল্পনা।
একসময় পৌছলাম আমাদের স্বপ্নের রবিনদের মাঠে। আমাদের চোখ এখন ধন্য হবে চোর দেখে। অসংখ্য মানুষের ভীড় সেই মাঠের চারদিকে। এত ভীড় তো আমি কখনও মেলাতেও দেখি নি। আর হবে না বা কেন, চোর ধরা পড়েছে আমাদের পাড়ায়, বলতে গেলে আমাদের নিজেদের চোর। আমাদের একচ্ছত্র অধিকার। আমার কৌতুহলী চোখ চোরকে খুঁজছিল। বড়দের পায়ের ফাঁক দিয়ে আমি চোর খুঁজতে লাগলাম। পরে কে একজন বলল ওই যে মাঠের কোণায় যে লোকটাকে বেঁধে রাখা হয়েছে ওটাই চোর। আমি খুবই হতাশ হয়েছিলাম, এ চোরের কোন শিং নেই, একেবারেই মানুষের মতই দেখতে। এই লোকটাই নাকি রাত বিরাতে মানুষের বাসা থেকে টিউবওয়েল নিয়ে যায়। আর পাড়ার লোকজন যে যত ধরনের নির্যাতন জানে সবই তার উপর করছিল। কেউ তার নাকে মুখে মরিচের পানি ঢালছিল। কেউ কেউ ঘুরে ঘুরে কিলঘুষি মারছিল। এক মুরুব্বি গোছের লোক রবিনদের মাঠের ঢাল থেকে দৌড়ে এসে লাফিয়ে লোকটার বুকে লাথি মারল, পরে জেনেছিলাম এর নাম ফ্লাইয়িং কিক। ব্রুসলি নাকি এই লাথিতে খুবই পারদর্শী। আর ঘোড়া উকিল [তার নাম কীভাবে ঘোড়া উকিল হল সে গল্প আরেকদিন করব] একপাশে বসে তার পোষা ঘোড়াকে ক্রমাগত অর্ডার করে যাচ্ছিল ‘টম! টম! লাটি মেরে ওর বুকের শাটিটা বেংগে ফেলটো!’ টম এইকথার সারমর্ম বুঝতে পারে নি এই যা রক্ষা। তখন চোরদেরকে পুলিশে দেবার তেমন চল ছিল না, কেউ হয়তো এমন প্রস্তাব তুলেও নি। তাই লোকটিকে সারাদিন সেখানে বেঁধে দফায় দফায় পিটিয়েছিল, সবার উদ্যম কমে যাবার পরে তাকে ওখানে বেধেই সবাই যার যার বাড়ি চলে গিয়েছিল। আমরাও বাসায় চলে গিয়েছিলাম। তখন গোসল করে দুপুরে ভাত খাবার পরে আমাদেরকে ঘুমাতে হত। সেদিনও যথারীতি ঘুমিয়েছি, বিকেলে উঠে আর লোকটাকে পাই নি। এরপর আর আমার অবশ্য চোর দেখার লোভ জাগে নি। পাড়াতে তেমন আর চোর ধরা পড়েও নি, নাকি টিউবওয়েলের সংগে সংগে টিউবওয়েল চোরও বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

Comments
Post a Comment